"নীল শাড়ির মেয়েটি"
গল্পটা ছোট্ট একটা গ্রাম থেকে শুরু। গ্রামের নাম ছিল চরবাগান। নদীর ধারে, কাশবনের পাশ ঘেঁষে একটা ছোট স্কুল, আর তারই পেছনে ছিল একটা পুকুর—যেখানে বিকেল হলে গ্রামের মেয়েরা জল আনতে আসত।
সেই পুকুরপাড়েই প্রতিদিন বসে থাকত নিলয়। শান্ত, গম্ভীর স্বভাবের ছেলে। কলেজে পড়ে শহরে, কিন্তু ছুটিতে এলেই এই পুকুরপাড় তার প্রিয় জায়গা হয়ে যেত।
একদিন বিকেলে নিলয় দেখে, কাশবনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে—নীল শাড়ি, ভিজে চুল, হাতে কলস। চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে। মুখে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, কিন্তু চোখে গভীর কিছু গল্প লুকানো।
সেই প্রথম দেখাতেই নিলয় তার জীবনে নতুন এক রঙ খুঁজে পায়।
পরদিন সে অপেক্ষা করে। মেয়েটি আবার আসে। আবারও চুপচাপ জল নিয়ে যায়। কথা হয় না, শুধু চোখে চোখ পড়ে। কিন্তু সেই চোখেই যেন কথা ছিল।
তৃতীয় দিন নিলয় সাহস করে বলে ওঠে,
“তুমি নদীর মতো—শান্ত, গভীর, আর ছুঁয়ে গেলে মানুষ বদলে যায়।”
মেয়েটি হেসে জবাব দেয়,
“আর তুমি? তুমি কি পাথর, না জেলে, না কবি?”
নিলয় একটু চমকে গিয়ে বলে,
“হয়তো কবি… যদি তুমি আমাকে একটা গল্প দাও।”
সেই বিকেল থেকে শুরু তাদের কথা, গল্প, হাঁটাহাঁটি, আর নদীর জলে পা ডুবিয়ে স্বপ্ন দেখা।
মেয়েটির নাম ছিল রূপা। সে বলেছিল,
“আমি চিরকাল এখানে থাকব না, একদিন চলে যাবো শহরে। কিন্তু যদি তুমি আমার হাত ধরো, তাহলে সব ফেলে থেকেও যেতে পারি।”
নিলয় চুপ করে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে তার শহরে চাকরি পাওয়া জরুরি ছিল।
একদিন রূপা সত্যিই আর এল না। কোনো চিঠি, কোনো খবর, কিছুই না।
বছর পেরিয়ে যায়।
নিলয় একদিন ছুটি নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। পুরনো পুকুরপাড়ে যায়—নতুন রঙ করা এক স্কুলঘর, নতুন ভবন।
হঠাৎ ছোট্ট এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করে:
“এই স্কুলের ম্যাডাম কে?”
ছেলেটি বলে,
“রূপা ম্যাডাম। নীল শাড়ি পরেন। খুব সুন্দর গান করেন। আপনাকে কবি বলেন মনে হয়।”
নিলয়ের চোখে জল এসে যায়। নীল শাড়ির সেই মেয়েটি, নদীর ধারে যে একদিন গল্প চেয়েছিল, সে এখন এই গ্রামের আলো।
সে আর কিছু বলে না। শুধু পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে। জানে—আজ, কিংবা কাল, কেউ না কেউ পেছন থেকে ডাকবে—
“এই কবি, তুমি ফিরেছো?”
ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, শুধু অপেক্ষা করে এক ঠিক সময়ে ফিরে আসার।
0 Comments